অবসরের আগে একটা হিসাব সবাই চান
অবসরের তিন মাস আগে অনেকে এক্সেল খুলে শেষ বেসিক আর চাকরির বছর গুণতে বসেন। কেউ বলেন দুইশ ত্রিশ গুণ, কেউ বলেন শতকরা আশি। পেনশন পাতা শেষ বেসিক ও বছর নিয়ে মাসিক পেনশন, এককালীন আনুতোষিক আর পিআরএল ছুটির বেতনের একটা আনুমানিক দেখায়। এটা পেনশন পেমেন্ট অর্ডার নয়। পরিবারকে এই সংখ্যা দেখিয়ে ফ্ল্যাটের টোকেন দেবেন না।
সূত্রটা সরকারি চাকরির সাধারণ খসড়া। মাসিক পেনশন শেষ বেসিকের অংশ। আনুতোষিক প্রচলিত গুণকে। পাতায় যে গুণক লেখা, সেটাই ব্যবহার হয়। নিজের মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আদেশ থাকলে সেটা ফাইলে, টুলে নয়।
বেসিক কোথা থেকে আসবে, সেটাই বড় ভুলের জায়গা। গ্রেড জানা থাকলে ২০২৬ ক্যালকুলেটর বা ২০১৫ স্কেল থেকে আনুমানিক নিতে পারেন। কিন্তু অবসর যদি ২০২৬-এর কিস্তি সময়ে হয়, পূর্ণ নবম স্কেলের বেসিক ধরলে আনুতোষিক বেশি দেখাবে। স্লিপের বেসিকই লিখুন। ভাতা পেনশনের ভিত্তি নয়। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব যোগ করবেন না। উৎসব ভাতা অবসরের পরের বোনাস নয়।
সহকর্মী দুজনের চাকরির বছর এক হলেও ব্যক্তিগত বেতন ভিন্ন হতে পারে। অন্যের স্ক্রিনশট নিজের ধরে ঋণ করবেন না।
যা এই পাতা দেখায় না
পরিবার পেনশন, প্রতিবন্ধী নির্ভরশীল, কম্যুটেশন, গ্রুপ ইনস্যুরেন্স, জিপিএফ চূড়ান্ত, ছুটি নগদায়নের সব রূপ, বিভাগীয় মামলার দণ্ড—এগুলো নেই। শিক্ষক, সামরিক, পুলিশের বিশেষ রেট নেই। বেসরকারি চাকরি শেষে এই পাতা বন্ধ রাখুন। সেটা গ্র্যাচুইটি পাতা। দুই পাতার টাকা যোগ করে “মোট পাব” বলা ভুল।
পিআরএল ছুটির বেতন পাতায় একটি সরল রেখা। প্রকৃত ছুটির ব্যালেন্স ইবাস বা ছুটির রেজিস্টারে। ছুটি শূন্য হলে টুলের পিআরএল লাইন আপনার নয়, কেটে দিন। কম্যুটেশন নিতে চাইলে আলাদা ফর্ম। নমিনি ফর্ম আলাদা ডেস্ক।
আয়কর পাতা চাকরির আয়ের মডেল। অবসরোত্তর আয়ের সব রেয়াত সেখানে নাও থাকতে পারে। প্র্যাকটিশনারের সঙ্গে কথা বলুন। দুই পাতা জোড়া দিয়ে রিটার্ন ভরবেন না।
ধরুন স্লিপে বেসিক চব্বিশ হাজার, চাকরি পঁচিশ বছর, রেজিস্টারে পিআরএল দিন আছে। টুলে সেই বেসিক ও বছর দিন। বাড়ি ভাড়া যোগ করবেন না। কেউ পূর্ণ বত্রিশ হাজার ধরে হিসাব করলে আপনার ফল মিলবে না, কারণ আপনার স্লিপ এখনো কিস্তি। মেমো না এলে স্লিপ জিতবে।
এই পরামর্শ কখন কাজে লাগে না
স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পেনশন ট্রাস্ট, প্রকল্পের চুক্তিভিত্তিক কাজ, দৈনিক মজুরি, আউটসোর্স গার্ড—তাঁরা এই সূত্রে পড়েন না। অবসরের পর নতুন কনট্রাক্ট আলাদা বেতন, পেনশনের সঙ্গে মেশাবেন না। বিদেশে চাকরির সময় বাদ পড়লে বছর কমান, টুল সেটা জানে না।
পিপিও হাতে এলে টুল বন্ধ করে ফাইল মানুন। আনুমানিক আর চূড়ান্ত গুলিয়ে পরিবারকে প্রতিশ্রুতি দেবেন না। এই টুল সিজিএ সফটওয়্যার নয়। পেনশন ভুল হলে আপিলের ভিত্তি এই স্ক্রিনশট নয়। গেজেট বদলালে সূত্র বদলায়। খাতায় লিখুন: আনুমানিক, চূড়ান্ত নয়। তিন মাস আগে ফাইল জোগাড় করুন। টুল শেষ রাতের একমাত্র ভরসা নয়। হিসাব শাখায় মিলিয়ে স্বাক্ষর নিন।
অবসরের আগে যে হিসাব মানুষ চান
অবসরের দুই বছর আগে অনেকে রাতে ক্যালকুলেটর খোলেন। চান একটা সংখ্যা, যা দিয়ে ফ্ল্যাট বা গাড়ির প্ল্যান করা যায়। পেনশন পাতা যে সূত্র দেখায়, সেটা সাধারণ অনুমান। চাকরির ধরন, কম্যুটেশন, পরিবার পেনশন, চিকিৎসা ভাতা, সর্বশেষ বেসিক, গড় বেসিক—অফিস ভেদে ফারাক। টুলের সংখ্যা দিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে বসবেন না। পেনশন কেস ফাইল ও অ্যাকাউন্টস জিতবে।
এক চাচা বলছিলেন, সহকর্মী ফেসবুকে লিখেছেন পেনশন বেসিকের শতভাগ। তিনি সেই আশায় খরচ বাড়িয়েছিলেন। পরে কেস ফাইলে অন্য ছক এল। সম্পর্ক ও অর্থ দুই দিক চাপ। তাই টুল চালানোর পর খাতায় লিখুন: এটা অনুমান, অমুক সূত্র, অমুক তারিখ। পরিবারকেও তাই বলুন। পূর্ণ আশ্বাস নয়।
কী লিখবেন, কী লিখবেন না
সর্বশেষ বেসিক জানা থাকলে সেটা দিন। না জানা থাকলে পে স্কেল থেকে আনুমানিক বেসিক এনে পেনশনে বসাবেন না গুলিয়ে। দুই পাতা দুই কাজ। পে স্কেল চাকরির বেতন। পেনশন অবসরের হিসাব। গ্রেড আর চাকরিকাল ঠিক মতো না জানলে ফল অর্থহীন। চাকরিকালে ছুটি ছাড়া গণনার নিয়ম অফিস বলে। টুল সেই ফাইল পড়ে না।
কম্যুটেশন নিলে এককালীন টাকা বাড়ে, মাসিক কমে। টুল যদি অপশন দেয়, দুই দিকই দেখুন। সহকর্মীর কম্যুটেশন আপনার সিদ্ধান্ত নয়। পরিবার পেনশন, নমিনি—এগুলো ফর্মের কাজ, ক্যালকুলেটরের নয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ই-পিপিও—অফিসের প্রক্রিয়া। এই সাইট পেনশন অফিস নয়।
বেসরকারি চাকরি ও গ্র্যাচুইটি
প্রাইভেট চাকরির পিএফ, গ্র্যাচুইটি, পেনশন স্কিম এই পাতা নয়। গ্র্যাচুইটি ক্যালকুলেটর শ্রম আইনের দিকে। সরকারি পেনশন অন্য আইন। দুইটা এক করে ভাইরাল পোস্ট বিশ্বাস করবেন না। ব্যাংক পেনশন, করপোরেশন, স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান—নিজস্ব বিধি থাকতে পারে। নিয়োগপত্র ও প্রতিষ্ঠানের সার্কুলার আগে। টুল সাধারণ সূত্র দেখায়, আপনার প্রতিষ্ঠানের ব্যতিক্রম ধরে না।
অবসরের পর পার্টটাইম আয়, কর, মেডিকেল বিল—পেনশন সংখ্যার বাইরে। কর পাতায় আলাদা হিসাব। পেনশনের ওপর কর নিয়ম বছরভেদে দেখুন, এই পাতায় জোর করে মেশাবেন না। স্ত্রী-সন্তানের নমিনি ফর্ম আপডেট আছে কি না, সেটা ক্যালকুলেটর চেক করে না। অফিসে খোঁজ নিন। টুল রাতের আশঙ্কা কমাতে পারে, ফাইল বদলায় না। ফাইলের জন্য কাগজ ও সময় রাখুন। সংখ্যা দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে ফাইল ফেলে রাখবেন না।
পরিবারকে সংখ্যা বলার ভাষা
স্ত্রী বা ছেলেকে বলুন, এই সংখ্যা আয়না, ঘর নয়। ঘর মানে যে টাকা ব্যাংকে ঢুকবে, সেটা কেস ফাইল। আয়না মানে রাতের হিসাব। আয়না দেখে ঘর কেনা যায় না। ফ্ল্যাটের কিস্তি পেনশন আয়না ধরে বাঁধবেন না। অবসরের তারিখ পেছালে, বেসিক বদলালে, কম্যুটেশন বদলালে সংখ্যা সরবে। সরবে বলেই খাতায় তারিখ লিখে রাখুন কোন সূত্রে চালিয়েছেন। দুই বছর পর মনে থাকে না। মনে না থাকলে পরিবার ভাবে লুকিয়েছেন। লুকাননি, ভুলেছেন। ভুলভাঙতে খাতা। টুল খাতা নয়, খাতা আপনি। টুল থেকে কপি করে খাতায় নামিয়ে রাখুন। এই এক কাজ অনেক অশান্তি কমায়।
স্বাস্থ্য ভাতা, উৎসব ভাতা অবসরের পর কীভাবে চলে, অফিস বলে। টুলে নাও থাকতে পারে। না থাকলে যোগ করে বড় সংখ্যা দেখাবেন না নিজে থেকে। বড় সংখ্যা দেখতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে আর নিয়ম আলাদা। নিয়ম ফাইলে। ফাইল অফিসে। অফিসে যান, শুধু রাতে ক্যালকুলেটর নয়। ক্যালকুলেটর ঘুম আনে কখনো, কখনো কেড়ে নেয় যদি সংখ্যা অবাস্তব হয়। অবাস্তব না রাখতে সূত্র পড়ুন, সহকর্মীর গুজব নয়। গুজব আরাম দেয় এক রাত, ফাইল কাটে বছর। বছরের দিক তাকান। রাতের সংখ্যা খসড়া রাখুন। খসড়া ছাপিয়ে বিয়ের কার্ডে পেনশন লিখবেন না। কার্ড সুন্দর হোক, সংখ্যা ফাইলের হোক।
অবসরের ফর্মের নমিনি পাতা আলাদা। টুল সেই পাতা ভরে না। নমিনি বদলাতে অফিসে যান। বদলানোর আগে সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না শুধু। সংখ্যা খসড়া, নমিনি মানুষ। মানুষ আগে। খসড়া পরে। পরে মানে ফর্মের পর রাতে আবার টুল চালানো যায়। ফর্মের আগে শুধু টুল চালিয়ে নমিনি বাদ দিলে পরে অনুশোচনা। অনুশোচনা না চাইলে ফর্মের তালিকা আলাদা খাতায় রাখুন। খাতায় নাম, টুলে সংখ্যা। দুই খাতা। এক খাতায় মেশাবেন না। মেশালে গুলিয়ে যায় কে কত পাবে। গুলিয়ে গেলে ঘর অশান্ত। অশান্ত না রাখতে দুই খাতা আজ খুলুন। আজ খোলা কালকের শান্তি।